ইরানকে ঘিরে চলমান সামরিক উত্তেজনায় বিশ্ববাজারে অস্থিরতা বাড়লেও কিছু বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের জন্য পরিস্থিতি হয়ে উঠেছে বিশাল মুনাফার সুযোগ। বিশেষ করে তেল-গ্যাস, ব্যাংকিং, প্রতিরক্ষা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের বড় কোম্পানিগুলো যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব কাজে লাগিয়ে রেকর্ড পরিমাণ আয় করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থা এবং মধ্যপ্রাচ্যের অনিশ্চয়তা বিশ্ব অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করলেও করপোরেট জায়ান্টগুলো এই সংকট থেকেই বিপুল আর্থিক সুবিধা আদায় করছে।
সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে জ্বালানি খাত। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের তেল ও গ্যাস হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ওই রুটে উত্তেজনা তৈরি হওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামে বড় ধরনের ওঠানামা শুরু হয়।
এই সুযোগে ব্রিটিশ জ্বালানি প্রতিষ্ঠান বিপি চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে ৩২০ কোটি ডলারের বেশি মুনাফা করেছে, যা আগের সময়ের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। কোম্পানিটি জানিয়েছে, তাদের জ্বালানি ট্রেডিং বিভাগ অস্বাভাবিক ভালো ফল করেছে।
শেলও প্রত্যাশার চেয়ে বেশি আয় করে প্রায় ৬৯২ কোটি ডলার মুনাফার ঘোষণা দিয়েছে। ফরাসি জ্বালানি প্রতিষ্ঠান টোটালএনার্জিসের আয়ও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এক্সনমোবিল ও শেভরনের আয় কিছুটা কমলেও বিশ্লেষকদের ধারণার চেয়ে ভালো ফল করেছে তারা। বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, তেলের উচ্চমূল্য দীর্ঘস্থায়ী হলে এসব প্রতিষ্ঠানের মুনাফা আরও বাড়তে পারে।
শুধু জ্বালানি নয়, যুদ্ধের অস্থিরতায় লাভবান হয়েছে বড় বড় ব্যাংকও। বিশ্ববাজারে শেয়ার ও পণ্যের দামে ব্যাপক ওঠানামার কারণে ট্রেডিং কার্যক্রম বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকগুলো বিপুল আয় করেছে।
জেপি মরগানের ট্রেডিং বিভাগ চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে ১ হাজার ১৬০ কোটি ডলার আয় করেছে। একই সময়ে ব্যাংক অব আমেরিকা, মরগান স্ট্যানলি, সিটিগ্রুপ, গোল্ডম্যান স্যাকস ও ওয়েলস ফার্গোসহ যুক্তরাষ্ট্রের বড় ব্যাংকগুলোর সম্মিলিত মুনাফা দাঁড়িয়েছে কয়েক হাজার কোটি ডলারে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকিভিত্তিক লেনদেন বেড়ে যাওয়ায় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বড় সুবিধা পাচ্ছে।
অন্যদিকে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে প্রতিরক্ষা খাতেও অস্ত্র ও সামরিক প্রযুক্তির চাহিদা বেড়েছে। ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ড্রোন প্রতিরোধ প্রযুক্তি এবং সামরিক সরঞ্জাম কেনায় নতুন করে জোর দিচ্ছে বিভিন্ন দেশ।
ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা কোম্পানি বিএই সিস্টেমস জানিয়েছে, বৈশ্বিক নিরাপত্তা সংকটের কারণে তাদের বিক্রি ও মুনাফা বাড়ছে। একইভাবে লকহিড মার্টিন, বোয়িং ও নর্থরপ গ্রুম্যানের মতো অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোও বিপুল অর্ডার পাওয়ার কথা জানিয়েছে।
তবে বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, প্রতিরক্ষা খাতের শেয়ারের মূল্য অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ায় ভবিষ্যতে কিছুটা চাপ তৈরি হতে পারে।
যুদ্ধ পরিস্থিতি নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতেও নতুন আগ্রহ তৈরি করেছে। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে অনেক দেশ ও প্রতিষ্ঠান এখন বিকল্প জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রতিষ্ঠান নেক্সটএরা এনার্জির শেয়ারের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ইউরোপের বায়ুশক্তি ও সৌরশক্তি খাতেও বিনিয়োগ বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা বিশ্ব অর্থনীতিকে চাপে ফেললেও কিছু করপোরেট প্রতিষ্ঠানের জন্য এটি পরিণত হয়েছে বিলিয়ন ডলারের ব্যবসায়িক সুযোগে।
আজকের খবর/ এম.এস.এইচ
