চট্টগ্রামে চাঁদাবাজির দৌরাত্ম্য বায়েজিদে আতঙ্কের নাম বার্মা সাইফুলফাউন্ডেশনের নামে চাঁদা দাবির অভিযোগ তদন্তে নেমেছে প্রশাসনচট্টগ্রামে চাঁদাবাজি সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের চরম আতঙ্কের শেষ কবেচাঁদা না দিলে আসে হুমকি ব্যবসা বন্ধের ভয় দেখানো হচ্ছে বলে একাধিক অভিযোগ
চট্টগ্রাম মহানগরীর বায়েজিদ বোস্তামী এবং আশপাশের এলাকায় চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী তৎপরতার অভিযোগে নতুন করে আলোচনায় এসেছে বার্মা সাইফুল নামে পরিচিত এক ব্যক্তি।স্থানীয়ভাবে সাইফুল ইসলাম নামেই বেশি পরিচিত এই ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে,দীর্ঘদিন ধরে একটি ফাউন্ডেশনের নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, প্রকল্প এবং সংগঠনের কাছে নিয়মিত অর্থ দাবি করে আসছেন তিনি।স্থানীয়রা বলছেন,সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে তাঁর কার্যক্রম আরও বেড়ে গেছে।তবে তাঁর মোবাইল নম্বরে একাধিকবার চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি এবং তাঁর বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় নানা সূত্রের দাবি,বায়েজিদ বোস্তামী, চান্দগাঁও, পাঁচলাইশ এবং কাছাকাছি এলাকার বিভিন্ন স্থানে একটি সংঘবদ্ধ চক্র বহুদিন ধরেই সক্রিয়।বাইরে থেকে তেমন দৃশ্যমান না হলেও নীরবে পরিকল্পিতভাবে ব্যবসায়ী, ঠিকাদার, উদ্যোক্তা এমনকি সাধারণ গৃহনির্মাণকারীদেরও টার্গেট করে চাঁদা দাবি করা হয়।কেউ চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে শুরু হয় নানারকম চাপ, হুমকি এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ।এসব অভিযোগ দিন দিন বাড়তে থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
বায়েজিদ এলাকার কয়েকজন ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, শুরুতে সামাজিক কার্যক্রম বা মানবিক কাজের কথা বলে সহায়তার অনুরোধ জানানো হয়। কিন্তু একবার টাকা দিলে তা নিয়মিত হয়ে দাঁড়ায়। এরপর নির্দিষ্ট সময় পরপর আবারও অর্থ দাবি করা হয়। কেউ টাকা না দিলে ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়া, দোকানে হামলা, কর্মচারীদের মারধর কিংবা মিথ্যা মামলার হুমকি দেওয়া হয় বলে তাদের দাবি।এ কারণে অনেকেই ভয় পেয়ে নীরব থাকেন এবং প্রকাশ্যে কথা বলতে দ্বিধা করেন।
চট্টগ্রাম নগরীর আরও কয়েকটি স্থানে একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। নিউ মার্কেট, বহদ্দারহাট, জিইসি, মুরাদপুর, আগ্রাবাদ, বন্দরটিলা, চকবাজার এবং বিভিন্ন ফুটপাত এলাকায়ও প্রভাবশালী কয়েকটি চক্রের কাছে নিয়মিত টাকা দিতে হয় বলে অভিযোগ হকারদের।
দোকানের আকার, বিক্রি এবং অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দিতে হয়। কেউ টাকা না দিলে দোকান উঠিয়ে দেওয়া বা বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হয় বলে তাদের অভিযোগ। livelihood বজায় রাখতেই বাধ্য হয়ে অনেকেই নিয়মিত অর্থ প্রদান করেন।
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের তথ্য অনুসারে গত ১৫ মাসে নগরীর বিভিন্ন থানায় চাঁদাবাজির অভিযোগে একাধিক মামলা হয়েছে এবং অনেককে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে।তবে পুলিশ সূত্র বলছে, প্রকৃত চিত্র এর চেয়ে আরও বড় হতে পারে। কারণ ভুক্তভোগীদের অনেকেই নিরাপত্তা শঙ্কায় মামলা করতে চান না। তাঁদের ধারণা,মামলা করলে আবারও টার্গেটে পড়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে অনেকেই নীরবে সহ্য করতে বাধ্য হন।
চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন এলাকায় যারা নতুন বাড়ি নির্মাণে নেমেছেন, তাঁদের অনেকেই বলেন, ভবন নির্মাণ শুরু হলেই কোনো না কোনোভাবে যোগাযোগ করা হয়।কেউ কেউ সরাসরি এসে কথা বলেন,আবার কেউ ফোনে জানান। নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দাবি করা হয়। কেউ না দিলে কাজ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি আসে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে সাধারণ মানুষ আতঙ্কের মধ্যে থাকেন এবং পরিবার নিয়েও উদ্বেগে থাকেন।
চট্টগ্রামের কয়েকজন নারী উদ্যোক্তার অভিজ্ঞতাও ভিন্ন নয়।তাঁরা অভিযোগ করেন, ব্যবসার পাশাপাশি পরিবার ও সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়েও এখন ভাবতে হয়। চাঁদা না দিলে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখানো হয়। এতে মানসিক চাপ বাড়ে এবং ব্যবসা পরিচালনায় প্রভাব পড়ে।
এমন পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীরা বলছেন, চাঁদাবাজি এখন শুধু একটি অপরাধ নয়, বরং এটি পুরো ব্যবসা পরিবেশের জন্য বড় হুমকি। বিনিয়োগকারীরা নিরুৎসাহিত হন।নতুন উদ্যোক্তা তৈরি কমে যায়। এতে কর্মসংস্থানও হ্রাস পেতে পারে। অনেকেই মনে করেন, এটি পুরো অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের অপরাধ বিভাগ জানিয়েছে, চাঁদাবাজির অভিযোগ পেলেই আইনের আলোকে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কেউ রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হোক বা পরিচিত হোক, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাউকে ছাড় দেয় না। তবে তাঁরা স্বীকার করেন, অনেক সময় চক্রগুলো সংঘবদ্ধ হওয়ায় এবং কেউ কেউ দেশের বাইরে অবস্থান করায় তদন্ত জটিল হয়ে ওঠে। তবুও অপরাধ দমনে তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে।
এই বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানার জন্য বার্মা সাইফুল নামে পরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে তাঁর বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। তবে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, তাঁর নেতৃত্বে কিছু তরুণ এবং কিশোরদের নিয়ে একটি গোষ্ঠী মোটরসাইকেলে শোডাউন করে এবং এলাকায় এক ধরনের ভয়ভীতি সৃষ্টি করে। যদিও এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই এখনো সম্ভব হয়নি।
আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, চাঁদাবাজি রোধে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, বরং দ্রুত বিচার, ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত অভিযান চালানোও প্রয়োজন বলে তারা মনে করেন।
এলাকাবাসী বলছেন, চট্টগ্রাম শুধু একটি শহর নয়, এটি দেশের অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু।এই শহরে যদি চাঁদাবাজি সংগঠিত রূপ নেয়, তবে এর প্রভাব পড়বে সারা দেশে। তাই তাঁরা প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন, নিরপেক্ষ তদন্ত করে চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য। যাতে সাধারণ মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারেন এবং ব্যবসা পরিবেশ আবারও নিরাপদ হয়ে ওঠে।
চট্টগ্রামের মানুষের প্রত্যাশা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি এবং ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো একসঙ্গে কাজ করবে।ভুক্তভোগীরা যেন নির্ভয়ে অভিযোগ করতে পারেন, সেই আস্থা ফিরিয়ে আনা হবে।তাহলেই হয়তো চট্টগ্রাম আবারও তার প্রাণবন্ত বাণিজ্যিক চিত্রে ফিরে যেতে পারবে। এই সাইফুলের রয়েছে কিছু অসাধু প্রশাসনের সাথেও গভীর আত্মার সম্পর্ক।
