চট্টগ্রামের খুলশী থানার পুলিশের বিরুদ্ধে মাদক কারবারিদের সঙ্গে যোগসাজশ ও সাংবাদিক নুরুল আজমকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর অভিযোগ উঠেছে। মাদকবিরোধী ধারাবাহিক সংবাদ প্রকাশের কারণে পরিকল্পিতভাবে এ মামলা করা হয়েছে বলে স্থানীয়রা মনে করছেন।
পারিবারিক বিরোধকে কেন্দ্র করে এবং পুরনো মামলার সূত্র ধরে গ্রেপ্তার করা হলেও, ৫ আগস্টের পুলিশ লাইন ভাঙচুরের সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে পরিবারের দাবি।
৯ জানুয়ারি ভোর ছয়টায় খুলশী থানার এসআই আনোয়ার পুলিশের সঙ্গে নুরুল আজমের বাসায় যান। বিনা ওয়ারেন্টে তাকে ঘর থেকে বের করে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়, যেখানে তার স্ত্রী, তিন বছরের শিশু ও বৃদ্ধা মা উপস্থিত ছিলেন। ভিডিওতে এই তৎপরতা এবং শিশুর আতঙ্কের দৃশ্য ধরা পড়ে।
স্থানীয়রা প্রশ্ন তুলেছেন, কেন ভোরবেলায় থানার ওসি একজন সাংবাদিককে ডাকার প্রয়োজন বোধ করেন? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও ভাইরাল হয়ে এসআই আনোয়ারের আচরণকে অপেশাদার এবং দায়িত্বহীন বলে সমালোচনা করা হয়েছে।
প্রায় ১২ বছর আগের একটি মাদকবিরোধী মানববন্ধনের ঘটনাকে পুঁজি করে নুরুল আজমকে টার্গেট করা হয়েছে, যদিও তিনি নিয়মিত মাদক ও অবৈধ কার্যক্রম নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করছিলেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, পুলিশ এবং মাদককারবারিদের মধ্যে আর্থিক স্বার্থের কারণে সাংবাদিককে নির্যাতন করা হচ্ছে।
এসআই আনোয়ারের পেছনে রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তনকারী একটি গোষ্ঠীর প্রভাব রয়েছে, এবং খুলশী থানার ওসি জাহেদুল ইসলামও মামলার প্রক্রিয়ায় যুক্ত বলে অভিযোগ। পাশাপাশি ওসির বিরুদ্ধে অবৈধ হোটেল ও রেস্টুরেন্ট থেকে মাসোহারা নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচনের আগে একটি বড় দলের নাম ব্যবহার করে সাংবাদিককে হয়রানি এবং ভোরবেলায় পুলিশ পাঠানো হলো ভয়ভীতি প্রদর্শনের অংশ। “রক্ষক যখন ভক্ষক হয়, তখন রাষ্ট্র ও নাগরিকের আস্থা ক্ষুণ্ন হয়।”
সাংবাদিক নেতারা এ ধরনের আচরণ গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য হুমকি বলে উল্লেখ করে অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের প্রত্যাহার, নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনি ব্যবস্থা দাবি করেছেন।
পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মামলাটি ‘হালকা’ এবং রাজনৈতিক চাপের কারণে লঘু মামলা দিয়ে সংবাদকের সম্মান বজায় রাখা হয়েছে। তবে এই স্বীকারোক্তি নিজেই প্রশ্নের উদ্রেক করেছে।
আইনজীবীরা বলেন, বিনা ওয়ারেন্টে গ্রেপ্তার আইনত সীমিত ক্ষেত্রেই বৈধ, এবং ‘ওসি কথা বলবেন’ অজুহাতে কাউকে ঘর থেকে বের করে আনা বা থানায় নেওয়া বেআইনি। তল্লাশির জন্য নির্দিষ্ট বিধি-নিষেধ অনুসরণ করতে হয়, তা না হলে তা অবৈধ বলে গণ্য হয়।
২০০৩ সালের সুপ্রিম কোর্টের রায়ে বলা হয়েছে, অপ্রয়োজনীয় গ্রেপ্তার করা যাবে না এবং রাজনৈতিক চাপের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার সম্পূর্ণ বেআইনি।
যদি গ্রেপ্তার বেআইনি প্রমাণিত হয়, তবে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারায় শাস্তিযোগ্য হবেন। বিভাগীয়ভাবে চাকরি স্থগিত, পদাবনতি বা বরখাস্তও হতে পারে। ক্ষতিপূরণ দাবিতে আদালতে রিট বা মামলা করা যাবে।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, “রাজনৈতিক চাপ ছিল” বলে পুলিশের স্বীকারোক্তি তারাই প্রমাণ করে যে গ্রেপ্তার অবৈধ। অন্য একজন বলেন, ভোরে বাসা থেকে সাংবাদিককে তুলে নিয়ে মামলা দেওয়া প্রক্রিয়ার অপব্যবহার।
সুশীল সমাজ বলছে, আইন রক্ষাকারী যখন আইন ভাঙেন, তখন সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। তাই স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন, পুলিশ সদস্যদের সাময়িক বরখাস্ত এবং বিচারিক তদন্ত জরুরি।
