বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা বাহিনীর (আরএনবি) এক বিস্ময়কর নাম হাবিলদার মো. ইউসুফ আলী। ২০০০ সালে সাধারণ সিপাহী পদে চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর থেকে গত ২৬ বছর ধরে তিনি চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশন আঁকড়ে ধরে আছেন। সরকারি চাকরিতে বদলি একটি স্বাভাবিক নিয়ম হলেও ইউসুফের ক্ষেত্রে তা যেন একেবারেই অচল। অভিযোগ রয়েছে, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মোটা অঙ্কের মাসোহারা দিয়ে তিনি বছরের পর বছর একই স্টেশনে নিজের খুঁটি শক্ত করে রেখেছেন। মাঝে মাঝে লোকদেখানো বদলি করা হলেও অদৃশ্য ক্ষমতায় দ্রুতই আবার নিজের পুরোনো জায়গায় ফিরে আসেন তিনি।
একই কর্মস্থলে দীর্ঘ আড়াই দশকের বেশি সময় থাকার কারণে পুরো স্টেশনের অপরাধ চক্র এখন তাঁর হাতের মুঠোয়। লোকমুখে শোনা যায়, ট্রেনের টিকিট কালোবাজারি থেকে শুরু করে মাদক ব্যবসা—সবখানেই তাঁর একচ্ছত্র আধিপত্য। বিশেষ করে ৭ নম্বর বাস কাউন্টারের আশপাশের মাদকের আস্তানা এবং দেশি মদের দোকানগুলো থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায়ের মূল হোতা হিসেবে তাঁর দিকেই আঙুল তুলছেন সবাই। সাধারণ যাত্রীরা যখন কাউন্টারে গিয়ে টিকিটের অভাবে ভোগেন, তখন এই হাবিলদারের ইশারায় সরকারি টিকিট চলে যায় কালোবাজারিদের হাতে। শুধু তাই নয়, স্টেশনের অবৈধ পার্কিং বাণিজ্যের মোটা অঙ্কের ভাগও নিয়মিত তাঁর পকেটে ঢোকে বলে ব্যাপক গুঞ্জন রয়েছে।
সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, এত লম্বা চাকরিজীবনে ইউসুফ আলীকে খুব কম সময়ই ডিউটিরত অবস্থায় ইউনিফর্ম পরতে দেখা গেছে। মাঠপর্যায়ে কাজ করার বদলে তিনি অফিসের চেয়ারে বসে ভুয়া টিএ (ভ্রমণ ভাতা) বিল তৈরিতেই বেশি ব্যস্ত থাকেন। অভিযোগ রয়েছে, প্রতি মাসে ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকার ভুয়া বিল বানানোর পাশাপাশি অন্যান্য স্টাফদের বিল পাস করিয়ে দেওয়ার বিনিময়ে নির্দিষ্ট অঙ্কের কমিশন আদায় করেন তিনি। স্টেশনে তিনি নিজেই এক অলিখিত ‘ক্যাশিয়ার’ প্রথা চালু করেছেন। গত ২৬ বছর ধরে এই প্রতারণার মাধ্যমে তিনি পাহাড়সম অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে হাবিলদার ইউসুফ আলী দীর্ঘকাল চট্টগ্রাম স্টেশনে কর্মরত থাকার বিষয়টি স্বীকার করেন। তবে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা যাবতীয় অভিযোগ মিথ্যা বলে দাবি করেছেন তিনি। অন্যদিকে, পুরো বিষয়টি নিয়ে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা বাহিনীর চিফ কমান্ড্যান্ট জহিরুল ইসলামের মন্তব্য জানার চেষ্টা করা হলেও তাঁকে দপ্তরে পাওয়া যায়নি এবং তাঁর মুঠোফোনে কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে একজন সাধারণ হাবিলদারের এমন বেপরোয়া কর্মকাণ্ড বর্তমানে রেলওয়ের প্রশাসনিক চেইন অব কমান্ড ও স্বচ্ছতাকে চরম প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে।
প্রতিবেদক আজকের খবর /
