পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার ৫নং শাঁখারীকাঠী ইউনিয়নের উত্তর শাঁখারীকাঠী বালিকা নিম্ম মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ৮ শিক্ষক ও তিন কর্মচারীর বিপরীতে ছাত্রী মাত্র ৩ জন। প্রধান শিক্ষক দাবি ও বিদ্যালয়ের ছাত্রীদের হাজিরা খাতা অনুযায়ী, প্রতি শ্রেণিতে ৩০ জনের বেশি ছাত্রী রয়েছে, কিন্তু সরেজমিনে দেখা গেল ভিন্ন চিত্র বিদ্যালয়ে উপস্থিত ছাত্রীর সংখ্যা মাত্র ৩ জন। এদিকে লাইব্রেরীতে পরে আছে বান্ডিল বাধা অবস্থায় নতুন বইগুলো।
বুধবার (০৫ মে) বেলা ১২টায় সরেজমিন দেখা যায়, ষষ্ঠ শ্রেণির হাজিরা খাতায় ৩৪ জন থাকলেও উপস্থিত ছিলেন মাত্র ২ জন। সপ্তম শ্রেণিতে ২৬ জনের জায়গায় দেখা মেলে মাত্র ১ জনের। যে অষ্টম শ্রেণিতে হাজিরা খাতায় ৩৬ দেখানো হয়েছে সেখানে দেখা মেলেনি কোনো ছাত্রীর। বিপরীতে বিদ্যালয়ে রয়েছেন ৮ জন শিক্ষক ও ৩ জন কর্মচারী।
দুপুর ১২টার দিকে দেখা যায়, কয়েকজন শিক্ষক অফিসকক্ষে বসে গল্প করছেন। ১ জন শিক্ষক ক্লান্তির ঘুম ঘুমাচ্ছে সহকারী প্রধান স্মার্ট ফোনে ইউটওব দেখছে। প্রধান শিক্ষক এরই মধ্যে হাজিরা সেরে বাড়ির পথে। কর্মচারী ৩ জনের ১জনকে পাওয়া গেলো বাকি ২জন সাংবাদিক আসার খবর শুনে ছুটে এলেন স্কুলে। ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে ২জন ও সপ্তম শ্রেণিতে ১জন ছাত্রীর ক্লাস নিচ্ছেন দুই শিক্ষক। অষ্টম শ্রেণীর কক্ষ ফাঁকা পড়ে আছে। এমন বাস্তবতায় বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে পড়ার শঙ্কা রয়েছে।
শিক্ষার্থীদের হাজিরা খাতাও ছিল অত্যন্ত অব্যবস্থাপূর্ণ। নিয়মিত রোল কল করা হয়নি। আশ্চর্যের বিষয় বিদ্যালয় বন্ধের দিনগুলোতেও খাতায় ‘সংকেতিক চিহ্ন’ দেওয়া আছে। হাজিরা খাতার দ্বায়িত্ব নিতে রাজি নন কোনো শিক্ষক।
এদিকে স্থানীয় একটি মহল বলছে বছরের পর বছর এমন অনিয়ম চলে আসছে স্কুলটিতে।
৬ষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্রী সংগীতা ঘরামী বলেন, আজকে ২জন উপস্তিত অন্য দিন ৫জন হয়। তার সহপাঠী ৩৬ জন তবে তাদের চিনেনা।
একই রোল না জানা মাহবুবা নামের এক ছাত্রী প্রতিদিন তারা ৫ সহপাঠী ক্লাস করে। ৫ জনের তিনজন আজকে কোথায় জানতে চাইলে বলেন, ১জন বরিশাল, ১জন বাড়ি, ১ জন এখানে ভর্তি হয়ে মাদরাসায় পড়ে।
৭ম শ্রেণীর হাজিরা খাতায় ২৬ জন ছাত্রী থাকা ক্লাস রুমে মিললো তৃপ্তি মজুমদারকে। তিনি জানান, তারা ৮জন সহপাঠী ১জন আসে না। তিনি তার ভাষ্যমতে ৮জন সহপাঠীদের নাম ঠিকানা জানেন না।
৭ম শ্রেনীতে ক্লাস নেওয়া অরুন কুমার মিস্তি নামের কৃষি শিক্ষক জানান, আজকে ১ জন ছাত্রী আছে,বাকিরা ধানের জন্য আসে নাই। কাগজে কলমে ২৫ জনের মত রেগুলার ৫-৭জন আসে। তিনি জানান,স্কুলে ছাত্রীর সংখ্যা কম সেটা অনেকবার মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসে জানানো হয়েছে।
ছাত্রী শূন্য অষ্টম শ্রেনীর কক্ষে পাওয়া গেলো শেফালী নামের এক কর্মচারীকে তিনি শিক্ষক আর কমচার্রী সংখ্যা জানেন কিন্তু মোট ছাত্রী কতজন বা প্রতিদিনের উপস্তিতি জানেন না।
নিজেকে ফিজিক্যালের শিক্ষিকা পরিচয় দেওয়া মাহফুজা নামের এক শিক্ষিকা জানান, উর্ধ্বতন কাউকে শিক্ষার্থী কম সেটা বলা হয় না। কিন্তু মাঝে মাঝে তারা আসেন এসে শিক্ষার্থী বাড়ান বলে চলে যায়।
স্কুলে সাংবাদিক আসার খবর পেয়ে ছুটে আসেন স্কুল প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে হওয়া প্রধান শিক্ষক পরিমল চন্দ্র বড়াল। তিনিও শিক্ষক-কর্মচারীর হিসাবটা জানলেও ছাত্রীদের হিসাব জানেন না। কোন ক্লাসে কতজন ছাত্রী প্রতিদিনের উপস্তিতি খবর রাখেন না। সাংবাদিকদের কোনো প্রশ্নের সদুত্তর দিতে পারলেন না তিনি। তবে সব অনিয়মের কথা অস্বীকার করে ছাত্রী সংখ্যা কম সেটা স্বীকার করে নেমে পড়লেন সাংবাদিক ম্যানেজ করতে।
হাতে টাকা নিয়ে ছুটে এলেন কালের কন্ঠের প্রতিনিধির কাছে প্রধান শিক্ষক। প্রধান শিক্ষক জানান তার অবসরের বাকি তিন মাস যদি একটু লেখেন তাহলে সমস্যা হবে।
নাজিরপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার (অ: দা:) মো. জহিরুল আলম বলেন, আমি বিষয়টি জানি না। এই স্কুলটা সম্পর্কে আমার ধারণা নাই। অভিযোগটি যাচাই-বাছাই করে দেখব। স্কুলের বিরুদ্ধে উর্ধ্বতন কতৃপক্ষে কাছে লিখব।
