আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট-এ রোববার (৮ মার্চ) সকালে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের সাংস্কৃতিক বিনির্মাণ : অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ কোন পথে?’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। স্টেকহোল্ডার্স অব বাংলাদেশ আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ হঠাৎ তৈরি হওয়া কোনো রাজনৈতিক ধারণা নয়; এটি জাতির দীর্ঘ ঐতিহাসিক সংগ্রাম ও সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার ফল।
বক্তারা উল্লেখ করেন, ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এ দেশের মানুষ তাদের আত্মপরিচয় ও রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে। সেই ধারাবাহিকতার আধুনিক রূপই বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। এটি কোনো কৃত্রিম বা পরিকল্পিত ধারণা নয়, বরং এ দেশের মাটি ও মানুষের সংস্কৃতির স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ।
গোলটেবিল বৈঠকটি পরিচালনা করেন শিক্ষক ও গবেষক ফারাহ্ দোলন। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সাংবাদিক মাসউদ বিন আব্দুর রাজ্জাক। প্রবন্ধে দেশের বর্তমান সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে দুটি বিপরীতমুখী কিন্তু সমানভাবে নেতিবাচক প্রবণতার কথা তুলে ধরা হয়।
বক্তারা বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে ‘কলকাতা-কেন্দ্রিক’ বাঙালি জাতীয়তাবাদকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়ার ফলে বাংলাদেশের লৌকিক ও নিজস্ব সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য অনেক সময় বাধাগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক বা আদর্শিক উদ্দেশ্যে ভাষাকে বিকৃত করে ‘আরোপিত ইসলামীকরণের’ চেষ্টা চলছে বলেও মন্তব্য করেন তারা।
বৈঠকে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়, স্বাধীনতাকে ‘আজাদী’, বিপ্লবকে ‘ইনকিলাব’, কিংবা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-কে ব্যঙ্গাত্মক নামে ডাকার প্রবণতা কোনো স্বাভাবিক সাংস্কৃতিক বিবর্তন নয়; বরং এটি চাপিয়ে দেওয়া একটি প্রক্রিয়া, যা এই ভূখণ্ডের কয়েক শতাব্দীর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্যকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম, প্রতিমন্ত্রী, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়। তিনি বলেন, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ ভাষা বা জাতিগত পরিচয়ের সীমা ছাড়িয়ে ভূখণ্ডভিত্তিক নাগরিক পরিচয়ের ওপর জোর দেয়। রাষ্ট্র এমন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক কাঠামো গড়ে তুলতে চায় যেখানে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতার পাশাপাশি সনাতনী, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সমান মর্যাদা পাবে।
গোলটেবিল বৈঠকে প্যানেলিস্ট হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট কণ্ঠশিল্পী রুমানা মোর্শেদ কনকচাঁপা, সংগীতশিল্পী ও রাজনীতিবিদ মুহাম্মদ আসিফ আলতাফ, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি-এর মহাপরিচালক রেজাউদ্দিন স্টালিন, পলিটিক্যাল ইকোনমিস্ট ড. সফিকুর রহমান, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি-এর ইংরেজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. আরিফুল ইসলাম এবং ‘আগামীর সময়’-এর হেড অব ক্রিয়েটিভ শিমুল সালাহউদ্দিন।
অনুষ্ঠানের সমাপনী বক্তব্যে স্টেকহোল্ডার্স অব বাংলাদেশ-এর মুখ্য সংগঠক ডা. সায়েম মোহাম্মদ বলেন, কোনো কিছু জোর করে চাপিয়ে না দিয়ে সংলাপের মাধ্যমেই জাতীয় সংহতি সম্ভব। গবেষণালব্ধ তথ্যের ভিত্তিতে একটি মানবিক ও বাংলাদেশপন্থি নীতিমালা প্রণয়ন করাই সংগঠনটির লক্ষ্য।
