সাংবাদিকতা হলো সমাজের আয়না। এই পেশার মানুষেরা সাহসের সঙ্গে সমাজের অসঙ্গতি, অন্যায় আর দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরেন, যার মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রের ভিত্তি মজবুত হয় এবং জনস্বার্থ সুরক্ষিত থাকে। কিন্তু সম্প্রতি বাংলাদেশে সাংবাদিকতার পরিবেশ নিয়ে যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা কোনো সুস্থ সমাজের লক্ষণ নয়। আপনার বক্তব্যটি এক্ষেত্রে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক এবং কপালে ভাঁজ ফেলার মতো: "সাংবাদিকতা এখন এই দেশে নিরাপদ নয় যেখানে পুলিশের কাছে সাংবাদিক নিরাপদ নয় সেখানে সাধারণ মানুষের কাছে কিভাবে নিরাপদ থাকবে সাংবাদিকরা।"
এই কথাটি কেবল একটি অভিযোগ নয়, এটি আমাদের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভূমিকা এবং দেশের সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর একটি কঠিন প্রশ্নচিহ্ন। যখন রাষ্ট্রের অন্যতম শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, যার কাঁধে নাগরিকদের নিরাপত্তা ও আইন রক্ষার দায়িত্ব, সেই প্রতিষ্ঠানের সদস্যদের হাতেই সাংবাদিকরা নির্যাতনের শিকার হন বা হুমকি অনুভব করেন, তখন বুঝতে হবে পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ।
পুলিশের কাজ হলো নাগরিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ তৈরি করা। কিন্তু যখন কোনো সাংবাদিক সংবাদ সংগ্রহের সময় বা তার প্রকাশিত সংবদের জেরে সরাসরি পুলিশের হয়রানি, মিথ্যা মামলা, বা শারীরিক আক্রমণের শিকার হন, তখন বার্তাটি স্পষ্ট—ক্ষমতার অপব্যবহার চলছে এবং সত্য প্রকাশের পথ রুদ্ধ করার চেষ্টা হচ্ছে। এটি শুধুমাত্র একজন সাংবাদিকের ওপর আক্রমণ নয়, বরং এটি নাগরিকদের জানার অধিকার এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত।
সাংবাদিক যদি পুলিশের কাছে নিরাপদ না থাকেন, তবে সমাজের অন্যান্য অপরাধী, মাফিয়া চক্র বা প্রভাবশালী মহলের কাছে তিনি আরও বেশি করে দুর্বল হয়ে পড়েন। কারণ, সাংবাদিকের বিপদের মুহূর্তে তিনি আইনি সুরক্ষা চাইবেন সেই পুলিশের কাছেই, যাদের ভূমিকা নিয়ে ইতোমধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। এই নিরাপত্তাহীনতার সংস্কৃতি সাংবাদিককে স্ব-আরোপিত সেন্সরশিপে বাধ্য করে, যা গণতন্ত্রের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। নির্ভীক সাংবাদিকতার অনুপস্থিতিতে দুর্নীতি ও অনিয়ম অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে, এবং সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। প্রথমত, সাংবাদিকের ওপর যেকোনো আক্রমণের ঘটনায় কঠোর ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে, বিশেষত যদি সেই আক্রমণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা জড়িত থাকেন। দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে, যাতে অন্য কেউ এই ধরনের অপরাধ করতে সাহস না পায়। দ্বিতীয়ত, পুলিশের প্রশিক্ষণে সাংবাদিক ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার গুরুত্ব সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দিতে হবে। সাংবাদিকদের প্রতিপক্ষ নয়, বরং গণতন্ত্রের সহযোগী হিসেবে দেখতে শেখাতে হবে।
গণতন্ত্রকে বাঁচাতে হলে সাংবাদিকতাকে বাঁচাতে হবে। রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে যে সাংবাদিকরা যেন স্বাধীনভাবে, ভয়মুক্ত পরিবেশে তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে পারেন। অন্যথায়, আমরা কেবল একটি নিরাপত্তাহীন সমাজের দিকেই এগোব না, বরং সত্যকে চাপা দিয়ে একটি ভঙ্গুর গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্ম দেব, যেখানে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার থাকবে অধরা। সময় এসেছে এই 'রক্ষকই ভক্ষক'-এর দুষ্টচক্র ভাঙার।
লেখকঃ এস.কে নুরনবী,আজকের খবর ২৪ বিডি
