ঈদুল ফিতরের সকালটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্নরকম। চট্টগ্রামের একটি সরকারি শিশুসদনের ছোট্ট উঠানে হঠাৎই ছড়িয়ে পড়ল অপ্রত্যাশিত আনন্দের ঢেউ। কেউ হাততালি দিচ্ছে, কেউ ছুটে আসছে, কেউবা দূর থেকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে — "আজ এখানে কী হতে যাচ্ছে?"
যেসব শিশুর কাছে ঈদ মানেই নিরবতা, সীমিত ব্যবস্থা আর অভাবের এক চাপা কষ্ট — তাদের জন্য এবারের দিনটি হয়ে উঠল পুরোপুরি ব্যতিক্রম। কারণ সেদিন তাদের কাছে শুধু একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা আসেননি — এসেছিলেন একজন অভিভাবক।
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা পবিত্র ঈদের দিনে নিজ পরিবারকে সময় না দিয়ে ছুটে এসে দাঁড়ালেন ঠিক সেই শিশুদের মাঝে — যাদের অধিকাংশেরই নেই মা-বাবার আদরের পরশ।
টেবিলজুড়ে সাজানো ফলমূল, মিষ্টি, চকলেট আর পাশে স্তূপ করে রাখা তরমুজ — সবকিছু যেন অপেক্ষায় ছিল ছোট্ট ছোট্ট হাতগুলোর জন্য। জেলা প্রশাসক যখন নিজ হাতে শিশুদের মাঝে ঈদের সালামি তুলে দিতে শুরু করলেন, তখন পুরো দৃশ্যপটই হয়ে উঠল গভীর আবেগময়।
একটি শিশু দু'হাত ভরে টাকা নিয়ে বিস্ময়ভরা চোখে তাকিয়ে আছে — সম্ভবত জীবনে এই প্রথম নিজের নামে ঈদের সালামি পেল সে। আরেকজন নতুন জামা বুকে আঁকড়ে ধরে রেখেছে, যেন এটিই তার সবচেয়ে দামি সম্পদ। উল্লাসের শব্দ, করতালি আর খুশির জোয়ারে মুহূর্তেই পাল্টে গেল গোটা পরিবেশ।
এখানে রয়েছে ১৭১ জন মানসিক প্রতিবন্ধী শিশু — যাদের কারও কারও বাবা-মা জীবিত থাকলেও তাদের কোনো খোঁজ নেই। পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান 'উপলব্ধি'র আশ্রয়ে হারানো পরিচয়ের বোঝা বয়ে বেড়ে উঠছে আরও ৮৪ জন কন্যাশিশু। এ ছাড়া সরকারি ছোট মনি নিবাসে আশ্রয় পেয়েছে ১৬টি ক্ষুদে প্রাণ — যাদের পরিচয়টুকুও অজানা, বিভিন্ন সময়ে হারিয়ে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে এখানে ঠাঁই হয়েছে তাদের। নিজেদের শেকড় কোথায় তা তারা কেউই জানে না।
এই শিশুদের কাছে ঈদ মানে সচরাচর অন্যদের উৎসব দূর থেকে নীরবে প্রত্যক্ষ করা। কিন্তু এবার সেই ব্যবধান ঘুচিয়ে দিল একটি মানবিক উদ্যোগ — একজন জেলা প্রশাসকের হৃদয়ের টান।
কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছিল না এই সফরে। তিনি শিশুদের পাশে বসেছেন, গল্প করেছেন, তাদের হাসির সঙ্গে নিজেও হেসেছেন। খাবারের মান যাচাই করেছেন, সার্বিক পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করেছেন — কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ যেটি করেছেন তা হলো — তিনি এই শিশুদের অনুভূতিকে অনুভব করার চেষ্টা করেছেন। কারণ এই শিশুদের সবচেয়ে বড় শূন্যতা হয়তো খাদ্য বা পোশাক নয় — বরং একজন আপনজনের উপস্থিতি।
প্রতিষ্ঠানের হাউজ প্যারেন্ট এনামুল হক, যিনি আটাশ বছর ধরে এখানে দায়িত্ব পালন করছেন, এই অভিজ্ঞতাকে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, "দুই যুগেরও অধিক সময়ে আমি কখনও প্রত্যক্ষ করিনি যে একজন জেলা প্রশাসক ঈদের দিনে স্বয়ং এখানে উপস্থিত হয়ে শিশুদের সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন। তিনি প্রতিটি শিশুকে স্বহস্তে ঈদের সালামি প্রদান করেছেন এবং শুভেচ্ছা বিনিময় করেছেন।"
সরকারি শিশু পরিবারের ডেপুটি সুপারিন্টেনডেন্ট তাসনিম আক্তার বলেন, "ডিসি মহোদয় আমাদের প্রতিটি শিশুকে সরাসরি নিজের হাতে ঈদের সালামি দিয়েছেন। শিশুদের প্রতি তাঁর আন্তরিকতা অসাধারণ। ঈদের দিনে তাঁকে কাছে পেয়ে শিশুরা অত্যন্ত আনন্দিত। এতিম ও দুর্দশাগ্রস্ত এই শিশুরা তাঁর কাছ থেকে সালামি পেয়ে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েছে। তিনি শিশুদের জন্য মিষ্টান্ন ও নানা ধরনের সুস্বাদু ফলফলাদি নিয়ে এসেছিলেন।"
ছোট মনি নিবাসের অফিস সহকারী নূর জাহান আবেগতাড়িত হয়ে বলেন, "আমাদের এখানে ১৬ জন শিশু রয়েছে, যারা বিভিন্ন সময়ে হারিয়ে গিয়েছিল। পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে এখানে তাদের ঠাঁই হয়েছে। আমরা কখনও কল্পনাও করিনি যে জেলা প্রশাসক ঈদের দিনে নিজ পরিবারের সঙ্গে না থেকে আমাদের এই প্রতিষ্ঠানে পরিদর্শনে আসবেন। শিশুরাও স্বপ্নেও ভাবেনি যে স্বয়ং ডিসি মহোদয় এসে তাদের হাতে ঈদের সালামি তুলে দেবেন। তাঁকে কাছে পেয়ে আমরা সকলে আজ অপরিসীম আনন্দিত।"
ঈদের এই মানবিক পরিদর্শন কেবল সরকারি প্রতিষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। পথহারা অনাথ শিশুদের ��েসরকারি আশ্রয়কেন্দ্র 'উপলব্ধি'তেও উপস্থিত হয়েছিলেন জেলা প্রশাসক।
প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান এম সাইফুল ইসলাম বলেন, "আমি গত ১৩ বছর ধরে এই সংস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত। আজ ঈদের দিনে ডিসি মহোদয় যেভাবে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের প্রায় সকল কর্মকর্তাকে এখানে সমবেত করেছেন, তা আমাকে গভীরভাবে আবেগাপ্লুত করেছে। এত ব্যস্ততার মধ্যেও তাঁরা আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন — এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত বড় প্রাপ্তি। আমার দৃঢ় প্রত্যয় যে আমাদের শিশুরা এতে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হবে। তাঁরা প্রতিটি শিশুকে ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন এবং সালামি দিয়েছেন, যা এই শিশুদের কাছে এক অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা।"
তিনি আরও জানান, "এখানে অবস্থানরত শিশুরা কোনো না কোনো সময়ে পথ হারিয়েছিল এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে আমাদের কাছে এসেছে। ফলে পারিবারিক উষ্ণতা তারা খুব কমই অনুভব করতে পারে। এভাবে কেউ কখনও তাদের ঈদের সালামি দেয়নি। এটি যেমন আমার কাছে আবেগঘন একটি মুহূর্ত, তেমনি তাদের কাছেও সম্পূর্ণ নতুন এক অনুভূতি।"
পরিদর্শন সেরে জেলা প্রশাসকের কণ্ঠে ফুটে উঠল এক গভীর উপলব্ধি। তিনি বলেন, "আজ ঈদের দিনে আমরা অসীম আনন্দ লাভ করেছি। ঈদ মানেই সকলের জন্য উৎসব। আজ আমরা সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এখানে এসেছি, আর সকলের মুখের হাসি দেখে আমরা পরিপূর্ণ তৃপ্তি পেয়েছি। ঈদ মানে হাসি, ঈদ মানে আনন্দ। আমরা প্রতিটি মানুষের মুখে হাসি প্রত্যক্ষ করতে চাই।"
'উপলব্ধি' প্রতিষ্ঠানে তাঁর অনুভূতির কথা তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, "ঈদ উদ্যাপনে আমরা বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি গ্রহণ করে থাকি। কিন্তু আজ 'উপলব্ধি' নামক এই সংগঠনটিতে এসে এই শিশুদের সান্নিধ্যে সময় কাটিয়ে আমি নতুনভাবে ঈদের প্রকৃত আনন্দকে উপলব্ধি করতে পেরেছি। আজ যখন আমি এখানে উপস্থিত হলাম এবং শিশুরা আমাকে গান শোনাল, তখন তাদের উচ্ছ্বাস দেখে আমরাও হৃদয়ের গভীর থেকে আনন্দিত হলাম। আজ সত্যিই মনে হলো — ঈদ একটি আনন্দের উৎসব, আর সেই আনন্দ আমরা এখানে এসে প্রত্যক্ষভাবে অনুভব করতে পেরেছি। আমাদের পুরো দিনটি অত্যন্ত চমৎকারভাবে কেটেছে, এবং আজ আমরা যেন ঈদের পরিপূর্ণ আনন্দটুকু অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি।"
তিনি আরও যোগ করেন, "আমাদের প্রত্যাশা, সামনের দিনগুলোতে এই শিশুরা আরও সু��্দরভাবে ঈদ উদ্যাপন করতে পারবে। আমরা চাই তাদের প্রত্যেকের মুখে হাসি ফুটুক। কারণ ঈদের মূল লক্ষ্যই হচ্ছে মানুষের মুখে আনন্দ ছড়িয়ে দেওয়া। আজ আমরা সেই উদ্দেশ্য নিয়েই এখানে উপস্থিত হয়েছিলাম — এই শিশুদের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য। তারা পরম আন্তরিকতায় আমাদের গ্রহণ করেছে এবং অনেক আনন্দ পেয়েছে। এ কারণেই আজকের এই ঈদের আয়োজনটি সার্থকতা পেয়েছে।"
এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি বলেন, "যাঁরা অবিরাম পরিশ্রম করে এই শিশুদের যত্ন ও দেখভাল করে চলেছেন, তাঁদের প্রতি আমাদের অকৃত্রিম কৃতজ্ঞতা রইল।"
একদিনের ভালোবাসা, দীর্ঘদিনের রেশ — ঈদের এই ক্ষণস্থায়ী আনন্দ হয়তো একসময় মিলিয়ে যাবে। কিন্তু এই দিনের স্মৃতি — একজন মানুষের স্নেহের ছোঁয়া, একটি নতুন পোশাক, এক মুঠো সালামি আর অসংখ্য ভালোবাসার মুহূর্ত — এসব কিছু এই শিশুদের হৃদয়ে গেঁথে থাকবে বহুদিন।
সমাজের সবচেয়ে উপেক্ষিত এই শিশুদের পাশে দাঁড়িয়ে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা প্রমাণ করে দিয়েছেন — প্রশাসন কেবল নথিপত্রে আবদ্ধ নয়, এটি হয়ে উঠতে পারে মানবিকতার এক শক্তিশালী মাধ্যম।
ঈদের আনন্দ যখন সকলের মাঝে ভাগাভাগি হয়, তখনই তা পরিপূর্ণতা লাভ করে। আর সেই পরিপূর্ণতার কাহিনীই রচনা করে গেল চট্টগ্রামের এই দিনটি — একজন কর্মকর্তা নয়, একজন খাঁটি মানুষের গল্প হয়ে।
