চট্টগ্রামে জেলা প্রশাসকের প্রতি সপ্তাহের জনশুনানি এখন সাধারণ মানুষের আশ্রয়স্থলে রূপ নিয়েছে। প্রতি সপ্তাহে নির্দিষ্ট দিনে বিভিন্ন সংকটে জর্জরিত মানুষ ছুটে আসেন সাহায্যের প্রত্যাশায়। তাদের প্রতিটি কথা গভীর মনোযোগে শ্রবণ করেন জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা, যাঁকে এলাকাবাসী ইতোমধ্যে "মানবিক ডিসি" উপাধি দিয়েছেন।
গত বুধবার (২৫ মার্চ) আয়োজিত সাপ্তাহিক জনশুনানিতেও সেই চিত্রেরই প্রতিফলন ঘটে। ভোর থেকেই জেলা প্রশাসকের দফতরে উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যায়। কেউ এসেছেন স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় নির্বাহে, কেউ ঘরের ছাদ মেরামতে, আবার কেউ পড়াশোনা অব্যাহত রাখতে অর্থের সন্ধানে। জেলা প্রশাসক সকলের বক্তব্য শুনে চাহিদা অনুসারে সাথে সাথে সাহায্য প্রদান কিংবা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের আদেশ দেন।
সেদিনের জনশুনানিতে উপস্থিত হন আশীষ কুমার দাশ (৫৬), চট্টগ্রাম মহানগরের ১৫ নম্বর বাগমনিরাম ওয়ার্ডের সাময়িক অধিবাসী। বহুদিন যাবৎ তিনি উচ্চ রক্তচাপ ও যকৃতের জটিল সমস্যায় কষ্ট পাচ্ছেন। রোগাক্রান্ত দেহ নিয়েও একটি ফিজিওথেরাপি সেন্টারে সামান্য বেতনে চাকরি করে পাঁচজনের সংসার টানতে গিয়ে তিনি রীতিমতো বিপর্যস্ত। তাঁর দুর্দশার বিবরণ শুনে জেলা প্রশাসক সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক সাহায্য প্রদানের আদেশ দেন।
ওই একই দিনে সুবিধা লাভ করেন মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম। অভাব, শারীরিক অসুস্থতা ও আয়ের অনিশ্চয়তার জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে অত্যন্ত কঠোর জীবনযাপন করছিলেন। উন্নত স্বাস্থ্যসেবা ও বাসস্থান সংস্কারে সাহায্য প্রার্থনা করলে তাঁর দরখাস্ত যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা হয়। সাহায্য পেয়ে আনন্দে আপ্লুত জাহাঙ্গীর আলম জানান, জেলা প্রশাসক অসীম ধৈর্য নিয়ে তাঁর সমস্ত কথা শুনেছেন এবং তিনি প্রকৃতপক্ষেই একজন সহানুভূতিশীল কর্মকর্তা।
স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ না পেয়ে যন্ত্রণায় থাকা হাছিনা বেগমও সেদিন শূন্য হাতে ফিরে যাননি। চট্টগ্রামের অলংকার মহল্লার এই অসুস্থ মহিলা দুটি সন্তান সঙ্গে নিয়ে ভয়াবহ আর্থিক দুরবস্থায় জীবন অতিবাহিত করছিলেন। তাঁর আর্জি শোনামাত্র তাৎক্ষণিক সাহায্য পৌঁছে দেওয়া হয়।
জনশুনানির সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী অধ্যায় ছিল একজন মেধাবী ছাত্রের ভবিষ্যৎ রক্ষায় এগিয়ে আসা। পটিয়া উপজেলার মেলঘর গ্রামের ওই শিক্ষার্থী ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের 'ক' ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় সফল হয়ে মৎস্যবিজ্ঞান বিভাগে অধ্যয়নের সুযোগ অর্জন করেছেন। পাশাপাশি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষাতেও তিনি সাফল্যের স্বাক্ষর রাখেন। তবে ভর্তি ফি, আবাসন ফি ও ���নুষঙ্গিক ব্যয় মিলিয়ে প্রায় বিশ হাজার টাকার প্রয়োজন দেখা দেওয়ায় তাঁর উচ্চশিক্ষার পথ রুদ্ধ হয়ে পড়ে। বিষয়টি অবগত হওয়ার পর জেলা প্রশাসক সম্পূর্ণ সাহায্য নিশ্চিত করেন। ফলে থেমে যাওয়া স্বপ্ন পুনরায় চলার গতি ফিরে প��য়।
জেলা প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাগণ জানিয়েছেন, জেলা প্রশাসক এই জনশুনানিকে নিছক আনুষ্ঠানিক রীতি হিসেবে নয়; বরং জনগণের সমস্যার বাস্তবসম্মত নিষ্পত্তির একটি ফলপ্রসূ মঞ্চ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। প্রতিটি আবেদন সযত্নে বিচার-বিশ্লেষণ করা হয় এবং দ্রুততম সময়ে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
এলাকাবাসীর অভিমত, এই ধরনের সংবেদনশীল প্রশাসনিক অনুশীলন সাধারণ মানুষের হৃদয়ে বিশ্বাস ফিরিয়ে আনছে। একজন সরকারি দায়িত্বশীল ইচ্ছা করলে কীভাবে সাধারণ নাগরিকের জীবনধারায় সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারেন—জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা তার এক দৃষ্টান্তমূলক নজির স্থাপন করেছেন। এই মহৎ উদ্যোগ চলমান থাকলে সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়ানোর এই রীতি আরও দৃঢ় ভিত্তি পাবে বলে আশাবাদী স্থানীয় জনসাধারণ।
