কুমিল্লাসহ দেশের ৪২টি জেলা পরিষদে নতুন প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে কুমিল্লা জেলা পরিষদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির কুমিল্লা বিভাগের সহ সাংগঠনিক সম্পাদক হাজী মোস্তাক মিয়া। রবিবার (১৫ মার্চ) এই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেসসচিব সুজাউদ্দৌলা সুজন মাহমুদ।
স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা এবং জেলা পর্যায়ে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যেই এ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে জেলা পরিষদগুলোর প্রশাসনিক কার্যক্রম আরও গতিশীল ও কার্যকর হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে অনুভূতি জানতে চাইলে হাজী মোস্তাক মিয়া মুঠোফোনে বলেন, আমি কুমিল্লা জেলা পরিষদের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ায় সম্মানিত বোধ করছি। এই দায়িত্ব আমার কাছে কেবল প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়, বরং জনগণের কল্যাণ, উন্নয়ন কার্যক্রমকে ত্বরান্বিত করা এবং স্থানীয় সরকারকে আরও শক্তিশালী করার একটি সুযোগ। আমার রাজনৈতিক জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগকে কাজে লাগিয়ে আমি চাই কুমিল্লা জেলার মানুষদের সেবা আরও কার্যকরভাবে পৌঁছাতে। আমি সকল রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় রেখে শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ জেলা গঠনে কাজ করার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
এদিকে, হাজী মোস্তাক মিয়া দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর রাজনীতিতে সক্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন। ছাত্ররাজনীতি থেকে শুরু করে জেলা ও কেন্দ্রীয় রাজনীতির বিভিন্ন স্তরে দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে তিনি কুমিল্লা অঞ্চলে একজন দক্ষ সংগঠক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। প্রায় তিন দশকের রাজনৈতিক জীবনে আন্দোলন সংগ্রাম, সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড এবং নেতৃত্বের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে তিনি দলীয় রাজনীতিতে একটি সুপরিচিত নাম হয়ে উঠেছেন।
তার রাজনৈতিক জীবনের সূচনা হয় ছাত্রজীবনে। ১৯৯২ সালে বিএনপির অঙ্গসংগঠন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের মাধ্যমে তিনি রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। শুরু থেকেই তিনি তৃণমূল পর্যায়ের সাংগঠনিক কার্যক্রমে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ১৯৯৫ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত কুমিল্লা অঞ্চলে ছাত্রদলের বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশ নিয়ে তিনি একজন দক্ষ সংগঠক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। এই সময়ে স্থানীয় পর্যায়ে তার নেতৃত্বগুণ প্রকাশ পায় এবং দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে আস্থার জায়গা তৈরি করতে সক্ষম হন।
১৯৯৯ সালে তিনি দক্ষিণাঞ্চল ছাত্রদলের নেতৃত্ব পর্যায়ে উঠে আসেন এবং ছাত্ররাজনীতিতে নিজের অবস্থান আরও সুসংহত করেন। পরবর্তীতে ২০০০ সালে দক্ষিণ ছাত্রদলের আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। ২০০১ সালে বিএনপি সরকার গঠনের পর দলীয় সাংগঠনিক কার্যক্রমে তার সম্পৃক্ততা আরও বৃদ্ধি পায়। ২০০২ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত তিনি কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের চট্টগ্রাম বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় তিনি বিভাগীয় পর্যায়ে সংগঠনকে শক্তিশালী করতে বিভিন্ন সাংগঠনিক উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
২০০৫ সালের পর থেকে তিনি ধীরে ধীরে ছাত্ররাজনীতি থেকে মূল বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। ২০০৬ সালে স্থানীয় বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রমে সরাসরি যুক্ত হয়ে মাঠ পর্যায়ের রাজনীতিতে নিজের অবস্থান আরও দৃঢ় করেন। ২০০৭ ও ২০০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তিনি বিএনপির বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন এবং সে সময় রাজনৈতিক চাপ ও মামলার মুখোমুখিও হন বলে দলীয় সূত্রে জানা যায়। এই সময় থেকেই তিনি কুমিল্লা অঞ্চলে একজন সক্রিয় সংগঠক হিসেবে পরিচিতি লাভ করতে থাকেন।
২০০৯ সালে তিনি কুমিল্লা জেলা বিএনপির রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণভাবে সম্পৃক্ত হন। এরপর ২০১১ সালে কুমিল্লা পৌর বিএনপির মেম্বার সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১২ সালে কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির প্রচার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব লাভের মাধ্যমে জেলা পর্যায়ের রাজনীতিতে তার অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়। ২০১৩ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত সরকারবিরোধী বিভিন্ন আন্দোলন ও কর্মসূচিতে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে তিনি দলীয় সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
২০১৬ সালের ১৯ মার্চ অনুষ্ঠিত বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলের পর দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া তাকে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সহ সাংগঠনিক সম্পাদক একই সাথে জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব প্রদান করেন। এই দায়িত্ব লাভের মধ্য দিয়ে তিনি কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে আসেন এবং দলের সাংগঠনিক কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠেন।
পরবর্তীতে ২০২০ সালে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান তাকে কুমিল্লা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সহ সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব প্রদান করেন। এরপর থেকে তিনি কুমিল্লা বিভাগের বিভিন্ন জেলা ও মহানগরে দলীয় সাংগঠনিক কার্যক্রম তদারকি করে আসছেন এবং তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠনকে সুসংগঠিত করতে কাজ করে যাচ্ছেন।
রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সক্রিয় থাকার কারণে বিভিন্ন সময় তাকে নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। ২০২২ সালের ১০ ডিসেম্বর ঢাকায় বিএনপির গণসমাবেশকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তাকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তিনি জামিনে মুক্তি লাভ করেন এবং পুনরায় দলীয় কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হয়ে ওঠেন।
২০২৩ সালে কারামুক্ত হওয়ার পর তিনি সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদার করেন এবং কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সফর করে নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। ২০২৪ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে কুমিল্লা অঞ্চলে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে তার নাম রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনায় আসে। ২০২৫ সালেও তিনি দেশের বিভিন্ন জেলায় বিএনপির সাংগঠনিক সভা ও সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। একই বছর জার্মানির বার্লিনে প্রবাসী বিএনপি নেতাকর্মীদের পক্ষ থেকে তাকে গণসংবর্ধনা দেওয়া হয়।
বর্তমানে তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির কুমিল্লা বিভাগের সহ সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে কুমিল্লা বিভাগের বিভিন্ন জেলা ও মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রম সমন্বয় করা, দলীয় কমিটি পুনর্গঠন করা এবং তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা, আন্দোলন সংগ্রামে সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগের কারণে হাজী মোস্তাক মিয়া কুমিল্লা অঞ্চলে বিএনপির একজন প্রভাবশালী সংগঠক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। জেলা পরিষদের প্রশাসক হিসেবে তার এই নতুন দায়িত্ব কুমিল্লা অঞ্চলের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় নতুন গতি আনবে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের প্রত্যাশা।
